ব্রেকিং নিউজ

পোশাকখাতে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিক সংগঠনের এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে। তারা বলছে, দায় এড়াতে আক্রান্তের সংখ্যা লুকাচ্ছে মালিকরা।

দেশে করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারের জন্য তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের একটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন বিশেষজ্ঞরা।

সাধারণ ছুটির মধ্যে গত এপ্রিলের শুরুতে হঠাৎ করেই কারখানা চালু রাখার ঘোষণা তারা দিলে শ্রমিকরা দেশ থেকে ঢাকায় যাত্রা শুরু করেন; সমালোচনার মুখে বিজিএমইএ সিদ্ধান্ত বদল করলে ওই শ্রমিকরা আবার ফিরে যায়।

প্রায় দুই মাস ‘লকডাউনের’ পর গত মাসে কল-কারখানা খুললেও স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণ করতে বলা হয়। তবে তার মধ্যেই দেশে সংক্রমণের হার দ্রুত গতিতে বাড়ছে।

মঙ্গলবার যোগাযোগ করা হলে বিজিএমইএর জনসংযোগ শাখার চেয়ারম্যান খান মনিরুল আলম শুভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার কাছে সর্বশেষ যে তথ্য রয়েছে, তাতে সারাদেশে ২৯৯ জন পোশাক শ্রমিকের কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ সভাপতি ‍রুবানা হক ৩ জুন পর্যন্ত পোশাক খাতে আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা ২৬৪ জন উল্লেখ করে একে বিশাল সংখ্যার (৪০ লাখ) তুলনায় ‘স্বস্তিকর’ বলেছিলেন।

“আসলে পোশাক কারখানা খুললে মহামারী ছড়িয়ে পড়বে বলে যে হারে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।

গত এপ্রিলের শুরুতে কারখানা খোলার খবরে এভাবে ঢাকামুখী হয়েছিলেন শ্রমিকরা; পরে তাদের ফিরে যেতে হয়েছিল।

আক্রান্তের সংখ্যার বিশ্বাসযোগ্যতার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, তারা জেলার সিভিল সার্জনদের কাছ থেকে ‘অত্যন্ত সুচারুরূপে’ কোভিড-১৯ আক্রান্ত পোশাক শ্রমিকদের তথ্য সংগ্রহ করেন। এখানে কারও নাম বাদ পড়ার সুযোগ কম।

দেশে তৈরি পোশাক কারখানার বেশিরভাগই ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত; এর বাইরে চট্টগ্রামে আছে বেশ কিছু কারখানা। বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ২০০ এর বেশি।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তার এলাকায় দেড়শ জন পোশাক শ্রমিকের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশ নিজ নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন।

সাভারে পোশাক কারখানা বন্ধের সুপারিশ স্বাস্থ্য কর্মকর্তার

পোশাক শ্রমিকদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা কোন প্রক্রিয়ায় হয় অথবা সন্দেহভাজন কতজন শ্রমিক পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বিজিএমইএর জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে।

তিনি বলেন, “বারডেমের সহযোগিতায় চন্দ্রায় যে টেস্টিং ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে, সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ২০ জনের নমুনা টেস্ট করা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে সেখানে এখনও চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা শুরু হয়নি। বিজিএমইএর কর্মকর্তা মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) রফিক কোভিড-১৯ এর যাবতীয় চিকিৎসার বিষয়টি বলতে পারবেন।”

রফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিজিএমএইর টেস্টিং ল্যাবে পাঠানোর জন্য ৪৬ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। অচিরেই এই নমুনাগুলো পাঠানো হবে।

এর বাইরে পোশাক শ্রমিকরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রমিকরা সরকারি উদ্যোগে যে পরীক্ষা পদ্ধতি চলছে সেখানে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে থাকেন। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে পৃথক কোনো তালিকা পাঠানো হয় না। বিজিএমইএ শুধু আক্রান্তদের তালিকা করে থাকে।

তাকে এবিষয়ে আরও প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, তিনি এই বিভাগের প্রধান হলেও বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য আরও কমিটি রয়েছে। তারাও দেখছেন।

যাবতীয় তথ্যের জন্য রফিক বিজিএমইএর জনসংযোগ শাখার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন, যদিও জনসংযোগ বিভাগ থেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের প্রতিনিধিরা জানান, মহামারীর শুরুতে জেলার সিভিল সার্জন অফিসের পাশাপাশি শিল্প পুলিশের কাছ থেকে পোশাক শ্রমিকদের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও সম্প্রতি তারা সেই তথ্য আলাদা করে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

এ ধরনের তথ্য প্রকাশের পর বিভিন্ন মহলের চাপে পড়ার কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন শিল্প পুলিশ কর্মকর্তা।

মহামারীর ভেতরে কারখানা সচল করলে তাতে এই খাতের ৪০ লাখ শ্রমিকের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়বে বলে বার বার সতর্ক করে আসছিলেন শ্রমিক নেতারা। এখন কারখানা চালুর পর অনেক শ্রমিক আক্রান্ত হলেও মালিকপক্ষ পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ বোঝাতে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা লুকিয়ে রাখছে বলে তাদের অভিযোগ।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি জলি তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, যে পরিমাণ পোশাক শ্রমিক আক্রান্তের কথা বিজিএমইএ নেতারা শোনাচ্ছেন, তা জাতির সঙ্গে প্রতারণা। প্রকৃত পক্ষে কয়েক হাজার পোশাক শ্রমিক আক্রান্ত হয়েছেন।

“এদের অনেকে পরীক্ষা করাতে পারলেও বিজিএমইএর তালিকায় তাদের নাম আসেনি। আবার অনেকে বহুদিন চেষ্টা করেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারছে না।”

নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে জলি বলেন, ঈদের পর বেতন ও ছাঁটাই ইস্যুতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভারে আন্দোলনে নামা অনেক শ্রমিকের জ্বর-কাশি ছিল। কিন্তু তারা দিনের পর দিন পথে পথে ঘুরেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারেননি।

“তাদের মধ্যে মাত্র চারজন নমুনা পরীক্ষা করাতে পেরেছিল, তাদের সবারই রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে।”

আক্রান্তের সংখ্যা লুকিয়ে জনপদে ভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিক সংহতির নেতা তাসলিমা আকতার বলেন, পোশাকখাতে ঠিকমতো পরীক্ষা করানো হচ্ছে না। ফলে কতজন শ্রমিক আক্রান্ত, সেটা জানা যাচ্ছে না। ঠিক মতো পরীক্ষা না হলে আক্রান্ত শ্রমিকের সংখ্যা কখনও বাড়বে না।

তিনি বলেন, বিজিএমইএ শ্রমিকদের নমুনা সংগ্রহ করতে কিছু বুথ স্থাপন করলেও তাতে খুবই কম সংখ্যক সিরিয়াল নেওয়া হয়। অনেক শ্রমিক রাতে গিয়েও সকালের সিরিয়াল ধরতে পারেনি। আর কারখানা সচল থাকার কারণে শুক্রবার ছাড়া শ্রমিকরা সিরিয়াল দেওয়ার সুযোগ পান না।

“বিভিন্ন শ্রমঘন এলাকায় প্রচুর শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে আমরা খবর পাচ্ছি। তারা নাপা-প্যারাসিটামাল খেয়ে দুদিন বাসায় বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে ফিরে যাচ্ছে। তাতে করে আরও বেশি শ্রমিক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব বিষয়ে সঠিকভাবে নজর দেওয়ার কেউ নেই।”

বিজিএমইএর ২৯৯ সংখ্যার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তাসলিমা বলেন, “প্রকৃত তথ্য এটা নয়। এইখাতের মানুষজনকে সঠিকভাবে টেস্ট করানো গেলে বোঝা যেত যে কতজন শ্রমিক কোভিড-১৯ পজিটিভ পরিস্থিতি নিয়ে কারখানায় কাজ করছেন।”

গত বৃহস্পতিবার বড় রকমের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান আয়োজন করে গাজীপুরের চন্দ্রায় একটি টেস্টিং ল্যাব উদ্বোধন করে বিজিএমইএ। এই ল্যাবে দৈনিক গড়ে চারশ মানুষের পরীক্ষা করা যাবে বলে তখন বলা হয়েছিল।

শনিবার থেকে সেখানে নমুনা পরীক্ষা শুরু হবে বলে ঘোষণা করা হলেও তিন দিন বাদে মঙ্গলবারও সেই কাজ শুরু হয়নি।

মঙ্গলবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে এখনও নমুনা পরীক্ষা শুরু না হলেও পরীক্ষার জন্য রোগী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

একইভাবে সাভার, নারায়ণগঞ্জে আরও টেস্টিং সেন্টার চালু করার পরিকল্পনার কথা জানান হলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

এর আগে গত ১১ মে সাভারে একটি টেস্টিং ল্যাব চালুর জন্য দুজন টেকনিশিয়ানকে প্রশিক্ষণ দেয় বিজিএমইএ। পরে অবশ্য সেই কেন্দ্রটি চালু হওয়ার কথা নিশ্চিত করেনি বিজিএমইএ।

#বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে