ব্রেকিং নিউজ

আ.লীগ-বিএনপির রাজনীতিতে নীরব বিদ্রোহ

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::

বরিশালে রাজনীতিতে ভিন্ন এক চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাইরে ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ঘরোয়া কর্মসূচির মাধ্যমে দলের অস্তিত্ব ধরে রাখছে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে খ্যাতি পাওয়া জামায়াতে ইসলামী শুধু নামেই আছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে ঘিরে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বড় অংশ একটি শক্ত বলয় তৈরি করতে সক্ষম হলেও স্বস্তিতে নেই। দিন দিন তাতে বিভক্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলের মধ্যে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বঞ্চিত নেতা-কর্মীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহিদ ফারুক শামীমের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। ফলে জাহিদ ফারুকের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে।

দলঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ পুত্র হওয়ায় সাদিক বাড়তি সুবিধা নিয়ে দলের মধ্যে নিজস্ব মত প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সৃষ্টি করেছেন বিভাজন। প্রথমে মহানগরের নেতা নির্বাচিত, পরবর্তীতে বিনা বাধায় সিটি মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তরুণ এই নেতার দলের মধ্যে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে নানাভাবে বঞ্চিত আর অবহেলিত নতুন মেরূকরণ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় জাহিদ ফারুক শামীমের দিকে ঝুঁকছেন নেতা-কর্মীরা।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জাহিদ ফারুক শামীম মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়ার প্রবীণ এই নেতা নিজেকে মেলে ধরতেও সক্ষম হয়েছেন। সংঘাত নয়, নীরবে পথ চলো-এমন নীতিতে বিশ্বাসী পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অল্পদিনের ব্যবধানে দলের একটি স্বতন্ত্র বলয় তৈরিতেও সক্ষম হয়েছেন। পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা ও অবহেলিত নেতা-কর্মীদের বৃহৎ অংশ এখন জাহিদ ফারুক শামীমের রাজনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ সারির নেতা-কর্মীরা এখন সাদিকবিরোধী অবস্থানে চলে গেছেন। ফলে জাহিদ ফারুক শামীম শক্ত অবস্থান নিয়ে যেকোনো সময় মাঠে শোডাউন দিতে পারেন।

তার অনুসারীদের মধ্যকার বেশ কয়েকজন জানান, সদর আসনের এই সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের আসন্ন দলের কাউন্সিলের ঘুরে দাঁড়াতে চান। মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করাসহ যুব ও ছাত্রলীগের কমিটিতে অনুসারীদের অবস্থান নিশ্চিতের অপেক্ষায় রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, ইতোমধ্যে সাংগঠনিক দূরদর্শিতা এবং সফল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জাহিদ ফারুক শামীম হাইকমান্ডের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করায় তার প্রত্যাশাও পূরণ হতে চলেছে। এসব কারণে জাহিদ ফারুকের বলয় ইতোমধ্যে দলের মধ্যে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা সাদিক আবদুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নানা কারণে ইমেজ সংকটে পড়েছেন। নগর উন্নয়নের বদলে দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি ও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় নানা অভিযোগে অভিযুক্ত। সাদিক আবদুল্লাহ আগের মতো কেন্দ্রের সাড়া পাচ্ছেন না। স্থানীয়ভাবে মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের বৃহৎ অংশ ক্রমশই তার সঙ্গ ছাড়তে শুরু করেছে।

নিজের কারণে কোণঠাসা হওয়ার পথে মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ এখন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবছেন। তবে জাহিদ ফারুক শামীম কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে নারাজ। দলীয় কর্মসূচি পালনে এই নেতাকে এক মঞ্চে দেখা গেলেও অধিকাংশ সময় উভয় নেতা থাকছেন দুই মেরুতে। এ কারণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগের নীরব বিদ্রোহের বিষয়টি।

একই অবস্থা বিএনপিরও। পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার স্থানীয় নেতৃত্ব নিজের হাতে ধরতে চাইলেও ক্রমশই নেতা-কর্মী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। সংগঠনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক উপদল। সাবেক সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল ও বরিশাল (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁনের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে পৃথক দুটি বলয়। তাদের অবস্থানও ক্রমশই শক্তপোক্ত হচ্ছে। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা সরোয়ারের স্বেচ্ছাচারিতা ও নেতা-কর্মীদের অবমূল্যয়ন করায় এখন অনেকেই এই নেতার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন। ফলে সাংগঠনিকভাবে নাজুক বিএনপি সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে নামতে পারেনি।

জানা গেছে, পুলিশি নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ তুলে আসা বিএনপির ঘরে এখন সরোয়ারবিরোধী আওয়াজই বেশি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বরিশাল সদর আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে পদে থাকলেও আগের সেই জনপ্রিয়তা নেই। দলের মধ্যে একনায়কতন্ত্র আপৎকালীন নেতা-কর্মীদের পাশে না থাকা এবং সুদিনে অবমূল্যায়ন করায় প্রভাবশালী এই নেতাকে এখন মাসুল গুনতে হচ্ছে।

দলের স্থানীয় নেতৃত্বের এখন অভিযোগ, বিকল্প নেতৃত্ব সৃষ্টিতে নারাজ সরোয়ারের কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এখন বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে দলের দুঃসময়ে মাঠে থাকা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন লাইমলাইটে চলে এসেছেন। সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামালও কম নন। দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিছ জাহান শিরিনকে নিয়ে তিনিও দলের মধ্যে একটি সমান্তরাল মেরূকরণ সৃষ্টি করেছেন।

দলীয় কর্মসূচিতে নেতাদের এক কাতারে দেখা গেলে নীতিগত বিষয়ে রয়েছে ভিন্ন মত। এ নিয়ে সাম্প্রতিককালে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের নানা উদাহরণও দেখা গেছে। এখন অনেকেই চাইছেন দলের মহানগরের নেতৃত্ব থেকে সরোয়ারের প্রস্থান। কিন্তু সাবেক এই সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় পদে থাকার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পদ ধরে রাখতেও অনড়। এ নিয়ে দলের মধ্যে কমবেশি বিরোধ মাঝে মধ্যে রাজপথ পর্যন্তও গড়ায়।

এ প্রসঙ্গে এবায়দুল হক বলেন, দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে। স্থানীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিভাজনের বিষয়টি স্বীকারও করেন। তবে তিনি সরোয়ারের প্রসঙ্গে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে নারাজ। তার ভাষায়, বর্তমানে দলীয় পদ নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু আকার ইঙ্গিত করে বোঝাতে চেয়েছেন বিকল্প নেতা সৃষ্টিতে সরোয়ারের আপত্তি থাকায় নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে রেখেছেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়র হিসেবে এক নেতা সরোয়ারই বারবার মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি ভালো চোখে দেখছেন না। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার নিজস্ব মতামতও ব্যক্ত করেন। ফলে চানের সঙ্গে যে সরোয়ারের দূরত্ব রয়েছে তা-ও স্পষ্ট।

মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অভিমত সরোয়ারের কারণেই বিএনপির দুর্গ বরিশালের রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলনের দাঁড়াতেই পারছে না। যার কারণে গত সংসদ ও সিটি নির্বাচনে প্রার্থী সরোয়ার অনুসারীবিহীন একলা পথ চলেছেন।

জাতীয় পার্টির অবস্থা আরো করুণ। মাঝে মধ্যে এই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের রাজপথে দেখা গেলেও সাংগঠনিক কাঠামো একেবারেই নাজুক। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর এ চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে সাংগঠনিক ভিত দুর্বল, সেখানে জেলা ও মহানগরের দুই নেতা নিজেদের প্রভাব বিস্তারে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন।

জাতীয় পার্টি সাংগঠনিক কর্মসূচি ঘরোয়াভাবে পালন করে অস্তিত্ব ধরে রাখছে। তৃতীয় শক্তি হিসেবে পরিচিত এই দলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিভাজন। জেলা শীর্ষ নেতা অধ্যাপক মহশিন উল ইসলাম হাবুল ও মহাগরের নেতা মর্তুজা আবেদিন এখন দুই মেরুর নেতা। উভয়ের মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক হওয়ায় তাদেরও পৃথকভাবে কর্মসূচি পালনে মাঠে দেখা যায়।

একজন আরেকজনকে সহ্য করতে না পারায় মর্তুজা আবেদিন বসেন দলীয় কার্যালয়ে, হাবুল থাকেন নিজস্ব কার্যালয়ে। ফলে রাজপথের কর্মসূচিতে জোরালো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। দুই নেতা আলাদাভাবে নিজেদের অনুসারীদের নিয়ে কর্মসূচি পালন করে সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছেন। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও সিটিতে নির্বাচনে ইকবাল হোসেন তাপসকে প্রার্থী করা হলে সেখানেও দলীয় বিভাজনে মহানগরের নেতৃবৃন্দ নিষ্ক্রিয় থাকেন।

বরিশাল জেলা নেতৃবৃন্দ অধ্যাপক মহশিন উল হাবুলের নেতৃত্বে তাপসের নির্বাচনী কার্যক্রমে মাঠে নামলে অন্য গ্রুপ ক্ষমতাসীন দলীয় প্রার্থীকে সমর্থনে জানায়। একপর্যায়ে তাপস নিজেকে নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে গুটিয়ে নেন। সেক্ষেত্রে তাপসকে কেন্দ্র থেকে শাস্তিস্বরূপ বহিষ্কারও করেন। এ নিয়ে বরিশাল জাপার মধ্যে বিরোধ আরো স্পষ্ট হয়। সেই থেকে মহানগর ও জেলার দুই নেতা পৃথক অবস্থানে আছেন। এরশাদের মৃত্যুর পরে বরিশাল জাপায় গতি-প্রকৃতি বুঝে ওঠা যাচ্ছে না।

শোনা যায়, কে হচ্ছেন দলীয় চেয়ারম্যান তার দিকে তাকিয়ে আছে উভয় গ্রুপ। দলের ভেতরকার সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে ওশান এরশাদের সমর্থনে জেলার নেতৃবৃন্দ এবং জি এম কাদেরের পক্ষে মহানগরের নেতৃত্ব অবস্থান নিয়ে আছেন।

জামায়াত আছে নামে। গত ১০ বছরেও দেখা মেলেনি রাজপথে। সব সময় কৌশলে পথচলা জামায়াতের অবস্থান এখন বরিশালে নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে পুলিশি গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃবৃন্দের আটকের মধ্য দিয়ে জামায়াতের নেতৃত্ব আঁচ করা যায়। জামায়াতের শক্ত একটি ভোট ব্যাংক থাকলেও তা নাড়া দেওয়ার মতো কোনো নেতা গত ১০ বছরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে জামায়াতকে এখন বরিশাল রাজনীতিতে কাগুজে বাঘ বলা হয়। দলটির বরিশাল মহানগর আমির মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল এই আখ্যা মানতে নারাজ। তার ভাষায়, দলের ক্রান্তিকাল চলছে। সময় আসলে জামায়াতকে আবার স্বরূপে দেখা যাবে। ফলে বরিশালে নিরুত্তাপ রাজনীতিতে শুধু রাজপথে আওয়ামী লীগের একাংশকে প্ল্যাকার্ড হাতে দেখা যায়।

Leave a Reply