ব্রেকিং নিউজ

কাশ্মীরে নির্যাতন চালাচ্ছে ভারতীয় সেনারা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

মোদি সরকার সংবিধান থেকে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর ওই রাজ্যের বাসিন্দাদের ওপর ভারতের সেনাবাহিনী ভয়াবহ নির্যাতন চালাচ্ছে বলে অনেক দিন আগে থেকেই অভিযোগ উঠেছিল। এবার সেই অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি।

এ নিয়ে শুক্রবার (৩০ আগস্ট) প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে একাধিক সচিত্র প্রতিবেদন ও ভিডিও প্রকাশ করেছে সংবাদ মাধ্যমটি।

কাশ্মীরের একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছেন বিবিসি সংবাদদাতা। গ্রামবাসীর অভিযোগ, তাদেরকে তার ও লাঠি দিয়ে প্রহার করেছে সেনারা। এমনকি অনেককে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে। এমনকি তারা ওই সংবাদদাতাকে নিজেদের শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখান।

তবে বরাবরের মতোই এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও প্রমাণসাপেক্ষ নয়’ বলে দাবি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

গত ৫ তারিখ আগস্ট কাশ্মীরকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া ৩৭০ অনুচ্ছেদটি বাতিলের ঘোষণ দেয় মোদি সরকার। এরপর থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে কাশ্মীর।

কাশ্মীর অঞ্চলকে ধারণা করা হয় এমন একটি এলাকা হিসেবে যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সামরিক সদস্যদের অবস্থান রয়েছে, তার ওপর বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর সেখানে আরো অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ভারত সরকার। কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, অ্যক্টিভিস্টসহ পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এদের অনেককেই রাজ্যের বাইরের কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব পদক্ষেপ শুধুই রাজ্যটির জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে।

গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের সেনাবাহিনী কাশ্মীরে তথাকথিত সশস্ত্র জঙ্গিবাদ দমনে লড়াই করে যাচ্ছে। ভারতের অভিযোগ, ওই অঞ্চলের জঙ্গিদের সহায়তা করে পাকিস্তান। তবে সেই অভিযোগ কাশ্মীরের একাংশ নিয়ন্ত্রণে রাখা পাকিস্তান সবসময়ই অস্বীকার করেছে।

৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ করার সিদ্ধান্তকে ভারতের বিভিন্ন অংশের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই ‘সাহসী’ সিদ্ধান্তকে ভারতের গণমাধ্যমও প্রশংসা করে চলেছে সমানে। তবে কাশ্মীরের ওপর থেকে বিশেষ ব্যবস্থা প্রত্যাহার ও সেখানে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও।

সম্প্রতি বিবিসি সংবাদদাতা সামির হাশমি দক্ষিণ কাশ্মীরের অন্তত ৬টি গ্রামে ঘুরে দেখেন, যেগুলো গত কয়েকবছরে ভারত বিরোধী সশস্ত্র জঙ্গিবাদের উত্থানের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। সেসব গ্রামের সবগুলোর বাসিন্দাদের কাছ থেকেই নির্যাতনের একই ধরণের বক্তব্য জানতে পারেন সংবাদদাতা।

সেসব এলাকার ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। তবে গ্রামবাসীরা সংবাদদাতাকে তাদের শরীরের ক্ষত দেখিয়ে দাবি করেছেন যে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা।

একটি গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন যে ভারতের সংসদে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা আসার সাথে সাথে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায় সেনাবাহিনী।

একটি গ্রামের দু’জন বাসিন্দা, যারা সম্পর্কে দুই ভাই, সংবাদদাতাকে বলেন ওইদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে নিয়ে গিয়ে আরো কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে একসাথে দাঁড় করায়। অন্যান্যদের মত ঐ দুই ভাইও নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি।

ওই দুই ভাইয়ের একজন বিবিসিকে বলেন, ‘তারা আমাদের ব্যাপক মারধর করে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি- আমরা কী করেছি? কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেনি, কিছু বলেওনি। তারা আমাদের কেবল মারতেই থাকে।’

তিনি বলেন, ‘আমার শরীরের প্রতিটি অংশে তারা আঘাত করে। তারা আমাদের লাথি দেয়, লাঠি ও তার দিয়ে মারে, বৈদ্যুতিক শকও দেয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আমরা অজ্ঞান হয়ে যাই তখন বৈদ্যুতিক শক দিয়ে আমাদের জ্ঞান ফিরিয়ে আনে। লাঠি দিয়ে মারার সময় আমরা যখন চিৎকার করছিলাম, তখন আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য মুখে কাদা ভরে দেয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তাদের বারবার বলতে থাকি যে আমরা নির্দোষ। তাদের জিজ্ঞাসা করি কেন আমাদের নির্যাতন করছে? কিন্তু তারা এসব কোনো কথাই শোনেনি। নির্যাতনের একপর্যায়ে তাদের বলি যে আমাদের মেরো না, এর চেয়ে গুলি করো। সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুনয় করি, তিনি যেন আমাদের দুনিয়া থেকে তুলে নেয়।’

গ্রামের আরেকজন তরুণ জানান, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে কে কে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে তাদের নাম বলতে সেনা সদস্যরা তাকে বারবার চাপ দিতে থাকে।

এই তরুণ ও কিশোররা বিগত কয়েকবছর ধরে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের প্রতিমূর্তি হিসেবে অনেকটাই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

ওই তরুণটি সেনা সদস্যদের বলেন যে, তিনি তাদের নাম জানেন না। তারপর সেনা সদস্যরা তার চশমা, জুতা ও কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয়।

তরুণ বলেন, ‘আমার গায়ের কাপড় খোলার পর তারা আমাকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়, প্রায় দু’ ঘন্টা যাবৎ। যখনই অজ্ঞান হয়ে যেতাম, তারা বৈদ্যুতিক শক দিতো আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য। তারা যদি আবারো আমার সাথে এরকম করে, তাহলে আমি যে কোনোভাবে এর প্রতিরোধ করবো। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেবো।’

তিনি বলেন, সৈন্যরা তাকে এই বলে হুঁশিয়ার করেছে, গ্রামের কেউ যদি কোনো ধরণের বিক্ষোভে অংশ নেয় তাহলে তাদের পরিণতিও একই হবে।

গ্রামের মানুষ মনে করে, সেনা সদস্যরা এরকম নির্যাতন করেছে যেন গ্রামবাসীরা কোনো ধরনের বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পায়।

বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা ‘অভিযোগ অনুযায়ী কোনো নাগরিকের সাথে জবরদস্তি করেনি’ তারা।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আমান আনন্দ বলেন, ‘এধরণের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। এই অভিযোগগুলো শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা থেকেই করা হয়েছে।’

বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেছে দাবি করে ওই মুখপাত্র আরো বলেন, সেনাবাহিনীর নেয়া এসব পদক্ষেপের কারণে নিহত বা আহত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বিবিসি’র সংবাদদাতা বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখতে পান, সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। গ্রামবাসীরা তো তাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’মনে করে না। তাদের কাছে তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।

কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন কেড়ে নেয়ার পর সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে শ্রীনগরের সৌরা এলাকায়। কাশ্মীরের এই অঞ্চলের একটি জেলাতেই ফেব্রুয়ারিতে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। এই অঞ্চলেই ২০১৬ সালে জনপ্রিয় কাশ্মীরী জঙ্গি নেতা বুরহান ওয়ানি নিহত হয়, যার পর কাশ্মীরী তরুণদের অনেকেই ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিয়েছে।

কাশ্মীরের ঐ অঞ্চলে একটি সেনা ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানকার সেনা সদস্যরা নিয়মিত ভিত্তিতে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদদের খোঁজে ঐ গ্রামগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালায়। তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রায়ই সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াইয়ের কারণে ভুক্তভোগী হতে হয় তাদেরকে।

একটি গ্রামের একজন তরুণ জানায়, জঙ্গিদের খবর জোগাড় করে না দিলে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা হবে বলে তাকে হুমকি দিয়েছিল সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এমন নির্যাতন করা হয় যে দু’সপ্তাহ পরেও সে সোজা হয়ে বিছানায় শুতে পারছে না।

‘এরকম অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো আমি। তারা আমাদের এমনভাবে মারে যেন আমরা মানুষ না, পশু।’

নির্যাতনের শিকার আরেকজন বলেন, অন্তত ১৫-১৬ জন সেনা সদস্য তাকে মাটিতে ফেলে রড, লাঠি আর তার দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। তার ভারষায়, ‘আমার জ্ঞান ছিলই না। তারা আমার দাড়ি ধরে এত জোরে টানে যে আমার মনে হচ্ছিল যে আমার দাঁত উপড়ে আসবে।’

পরে জ্ঞান ফিরলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে একজন সৈন্য তার দাড়ি পুড়িয়ে দিতে চাইলেও আরেকজন সৈন্য বাধা দেয়ায় শেষপর্যন্ত তার দাড়ি রক্ষা পায়।

আরেকটি গ্রামে সংবাদদাতা সামির হাশমি এক তরুণের দেখা পান যার ভাই দু’বছর আগে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা হিজবুল মুজাহিদিন গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। তরুণটি জানান, একটি ক্যাম্পে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সেখান থেকে সে পায়ে ফ্র্যাকচার নিয়ে বের হয়।

তিনি বলেন, ‘আমার হাত পা বেঁধে উপুর করে ঝুলায় তারা। এরপর দুই ঘন্টার বেশি সময় ধরে আমাকে মারতে থাকে।’

কিন্তু সেনাবাহিনী কোনো ধরণের অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিবিসিকে দেয়া বিবৃতিতে সেনাবাহিনী নিজেদের ‘পেশাদার সংস্থা’ হিসাবে দাবি করে বলে, তারা মানবাধিকারের বিষয়টি বোঝে এবং সম্মান করে’। আর বিবিসি প্রতিবেদকের কাছ থেকে পাওয়া এসব নির্যাতনের ‘অভিযোগগুলো দ্রুততার সাথে তদন্ত করছে’বলেও তারা জানিয়েছে।

বিবৃতিতে তারা বলে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গত পাঁচ বছরে আনা ৩৭টি অভিযোগের ২০টিই ‘ভিত্তিহীন’হিসেবে পেয়েছে তারা। ওই অভিযোগগুলোর মধ্যে বেশিরভাগেরিই তদন্ত করেনি ভারত। ‘শুধুমাত্র ৩টি অভিযোগ তদন্ত করার যোগ্য’ বলে পেয়েছে তারা। অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর এ বিষয়ক রিপোর্টের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে কাশ্মীরিদের ওপর ভারতীয় সেনাদের নির্যাতনের ইতিহাস। যদিও এসব নির্যাতনকে ‘তদন্তের যোগ্যই’ মনে করেন না মোদির হিন্দুবাদী সরকার।

গত তিন দশকে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শতাধিক অভিযোগের সংকলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দু’টি কাশ্মীরী মানবাধিকার সংস্থা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে। ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ৪৯ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। কিন্তু জাতিসংঘের ঐ প্রতিবেদনকেও আমলে নেয়নি ভারত। কারণ, কাশ্মীর যে তাদের ‘আভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ নিয়ে কারো কোনো কথা বলা যাবে না।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পর সঙ্গে বৈঠকের সময় কাশ্মীরকে ‘দ্বিপাক্ষিক’ সঙ্কট বলে স্বীকার করেছেন নরেন্দ্র মোদি। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান কেরা হবে বলেও ট্রাম্পের কাছে অঙ্গীকার করেছেন মোদি। যদিও এর আগে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের একাধিক আলোচনার প্রস্তাব ‘সন্ত্রাসবাদের মদদ দেয়ার’ অজুহাত তুলে প্রত্যাখ্যান করেছিল ভারত।

Leave a Reply