ব্রেকিং নিউজ

জাঙ্গিয়া পরা ছবি দেখে আপনি যা ভাবছেন, আসলে যা হয়েছে…

শ্রমিকদের হামলার মুখে প্রতিরোধকারী পুলিশ সদস্যদের ভেতর একজন মানুষকে দেখা গেল হাতে অস্ত্র নিয়ে, পরনের স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি, লুঙ্গিটা উঠে গেছে, নিচে রঙ্গিন অন্তর্বাস দেখা যাচ্ছে। ব্যাস! আমরা বিশাল এক উপলক্ষ্য পেয়ে গেলেন ট্রল আর নোংরামির! টিটকারীর আর হাসাহাসির! পুলিশের মধ্যে জাঙ্গিয়া পরা এই লোক কিভাবে আসলো, নিশ্চয়ই সে সন্ত্রাসী!

কাপড়চোপড় ছাড়া সুপারম্যানগিরি দেখাতে আসছে, রাইফেলটা ঠিকই হাতে রাখছে, নতুন কোন বাহিনী নাকি এইটা! নিশ্চয়ই লুঙ্গিবাহিনী! হাতুড়ি-হেলমেটের পর এবার এলো লুঙ্গিবাহিনী, যারা লুঙ্গি মাথায় তুলে জাঙ্গিয়া দেখিয়ে বেড়ায়, গুলিও করে! এমন অজস্র অসংখ্য ট্রল, গালাগালি আর টিটকারীতে অনলাইন ভাসিয়ে দিলাম আমরা। অথচ খুবই অস্বাভাবিক এই ঘটনার পেছনে আসলে কারণটা কিন্তু ভিন্ন। কেন এই ব্যাক্তিকে স্রেফ অন্তর্বাস পড়া অবস্থায় হাতে অস্ত্র হাতে পুলিশের মাঝখানে অ্যাকশনে দেখা গেল! পেছনের গল্পটা কী?

আসুন জেনে আসি ঘটনার পেছনের সেই ঘটনা। রাজধানীর পোস্তগোলায় গত শুক্রবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুকে টোলমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলনরত পরিবহন শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। উন্মত্ত শ্রমিকদের আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে আক্রান্ত হন পুলিশ সদস্যরা। এসময় অস্ত্র হাতে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি ও অর্ন্তবাস পরিহিত এক ব্যক্তিকে দেখা যায় পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র হাতে অ্যাকশনে যেতে। বেশ কয়েকটি ছবিতে দেখা যায় তিনি গাছের আড়ালে কাভার নিয়ে গুলি ছুঁড়ছেন। তিনি আসলে কে, কেন পুলিশের মাঝখানে তাকে দেখা গেল সেসব নিয়ে বিন্দুমাত্র জানার চেস্টা না করেই আমরা তাকে নিয়ে ট্রল করতে শুরু করেছি, পুলিশকে গালাগালি করেছি। অথচ আসল ঘটনাটা ছিল একেবারেই ভিন্ন কিছু!

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শফিউর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, সে ব্যক্তির নাম এবাদত। তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ কনস্টেবল। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় কর্মরত একজন পুলিশ কনস্টেবল বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহজামান। শ্রমিকদের হামলায় আহত হয়ে বর্তমানে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা মানুষটা সেদিন সহকর্মীকে বাঁচাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, আক্রান্ত হয়েও অস্ত্র ছাড়েননি।

দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার ওসি শাহজামান জানান, গত শুক্রবার সকালে পোস্তগোলা এলাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতুতে ট্রাকের টোল বাড়ানোর প্রতিবাদে আন্দোলনরত শ্রমিকদের শান্ত করতে তিনি কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেসময় ৭/৮ জনের একটি দল এসে শ্রমিক ও পুলিশ উভয়ের ওপর হামলা চালায়।

এমন সময় পুলিশের এক সদস্যের মাথায় ইটের আঘাত লাগলে তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান এবাদত নামের ওই কনস্টেবল। উত্তেজিত ওই দলটি তখন এবাদতের উপর চড়াও হয়। ধস্তাধস্তিতে তার পরনের পোশাক খুলে ফেলে। মারধরের এক পর্যায়ে তাকে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাতের চেস্টা করে। তারপর অস্ত্র হাতে অর্ন্তবাস পরিহিত অবস্থায় দৌড়ে পাশের আনসার ক্যাম্পে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন এবাদত। কিন্তু ওদিকে সহকর্মীরা তো তখনো বিপদে! এবাদত কর্তব্য ফেলে নিরাপদে থাকতে পারেননি। সেখান থেকে একটি লুঙ্গি সংগ্রহ করে সেটা নিয়ে আবারও ঘটনাস্থলে যান, দৌড়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে তার পরনের লুঙ্গিটি খুলে যায়। নিজের আব্রুর দিকে খেয়াল ছিল না এবাদতের, পরোয়া করেননি কাপড়চোপড় গায়ে আছে নাকি নাই। অস্ত্রটা হাতে তার একমাত্র মনোযোগ ছিল তখন উন্মত্ত শ্রমিকদের ঠেকানো!

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শফিউর রহমান আরো জানান, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ অবস্থা ছিল। এলোপাথারি চর্তুদিক থেকে ইট পাটকেল মারা হচ্ছিল। পুলিশ শ্রমিকদের কন্ট্রোল করতে হিমশিম খায় সে সময়। লুঙ্গি পরা অবস্থায় দৌড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়েই এবাদতের লুঙ্গিটি খুলে যায়। সে তবুও অস্ত্র ছাড়েনি।

ছবি:ফেসবুক ক্নিনসট

অথচ এই মানুষটাকেও আমরা ট্রল করতে ছাড়লাম না। কল অফ ডিউটির ভিডিও গেইম খেলে খেলে অভ্যস্ত আমাদের আধুনিক জেনারেশনের তরুণেরা যখন একটা সত্যিকারের কল অফ ডিউটির ছবি দেখলো, বিকৃত আনন্দে সেটাকে নিয়ে তারা ট্রল শুরু করলো, টিটকারী দিতে লাগলো। অথচ সেদিন শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টা থেকে থেমে থেমে বেলা ১টা পর্যন্ত ভয়ংকর সংঘর্ষ ঘটেছে , থামাতে গিয়ে ওসিসহ ৩০জন পুলিশ আহত হয়েছেন, একজন শ্রমিকও মারা গেছে, ব্যাপক গাড়ি ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে।

তখন যদি পুলিশ নিজেদের জানের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে গেছে বলেই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারেনি। এবাদতের মত মানুষগুলো কল অফ ডিউটির অসাধারণ উদাহরণ রাখলেন জীবন বাজি রেখে, অথচ তাদের দায়িত্ব পালনের ছবি নিয়ে আমরা হাসিতামাশা করলাম সারাদিন, এতে যোগ দিয়েছিল আমাদের পত্রিকাগুলোও! একটাবার জানতেও চাইলাম না আমরা আসলে ঘটনাটা কি ঘটেছে। কোন সুস্থ মানুষ তো কখনো মাথায় লুঙ্গি বেঁধে জাঙ্গিয়া পড়ে অস্ত্র হাতে শো অফ করবে না, তাই না? তবুও কি বিচিত্র বিবেকহীন হিপোক্রেটের মত ট্রল করে গেলাম আমরা!

এই ঘটনা নিয়ে অ্যাডিশনাল এসপি মাসরুফ ভাইয়ের এই লেখাটায় উঠে এসেছে সব! আমাদের নির্লজ্জ দীনতা থেকে শুরু করে হাহাকারের কষ্টগুলো…
*
অন্তর্বাস পরা একজন পুলিশ সদস্যের ছবি নিয়ে ট্রলে ভরে গিয়েছে ফেসবুক। বিশ্বের সব দেশেই পুলিশকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা হয়, খোদ আমেরিকাতে তো “পিগ”-ও বলা হয় কিছু কিছু জায়গাতে। পুলিশের আকাম কুকাম সব দেশেই আছে, বেশি আর কম। ট্রল নিয়ে তাই মন খারাপ করাটা যুক্তিযুক্ত না।

তবে এই যে অন্তর্বাস পরা পুলিশ সদস্য, এই লোকটা তার ক্যাম্পে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। পরিবহন শ্রমিকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তার পোশাক ছিঁড়ে যায়, সেই অবস্থাতেও সে তার হাতের অস্ত্রটি হারায়নি, বরং ওই অবস্থাতেই যোগ দিয়েছে সঙ্গীদের সাথে।

পুলিশের প্রতি জনগণের অনাস্থার ব্যাপারটা বুঝি, রাগ ক্ষোভ ইত্যাদির কারণ যে মিথ্যে না এটাও জানি। প্রথমে এই ছবি দেখে একে বহিরাগত ভেবে ট্রল করাটাও ধরতে পারি।

কিন্তু এই লোকটির পরিচয় জানার পরও এবং কি পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে সে গিয়েছে এটা দেখার পরেও খুব শিক্ষিত এবং রূচিশীল কিছু মানুষ এটা নিয়ে হাসিঠাট্টা করছেন। এটাকে বীরত্ব বলে মানতে এনারা রাজি নন, বরং ঠাট্টা করে পুলিশ বাহিনীর বাকিদেরকেও অন্তর্বাস পরার পরামর্শ দিয়েছেন এনাদের কেউ কেউ।

শহর এলাকার একজন কন্সটেবল ষোল থেকে আঠারো ঘন্টা ডিউটি করে, কন্সটেবল এবাদতেরও তার ব্যতিক্রম হবার কথা না। নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপদের মুহূর্তে কেন এই লোকটার পোশাক ঠিক নেই এটা নিয়ে যারা ট্রল করছেন, আমি বাজি রেখে বলতে পারি আপনাদের কখনও জীবন বাজি রেখে ওরকম পরিস্থিতিতে পরতে হয়নি।

শ্রদ্ধেয় বড়ভাই মেজর তামুর হাসান দারুন একটা কথা বলেছেন- “Life has a color that the protected will never know”; আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে পোশাক হারানো কন্সটেবল এবাদত হচ্ছে আপনাদের হাসিঠাট্টার পাত্র।

এর পরে যখন দাঙ্গা হাঙ্গামা হবে, পুলিশ সদস্যরা তখন সেটা নিয়ন্ত্রণ করে আপনাদের জান মালের হেফাজতের আগে নিজের পোশাক আশাকের দিকে দিকে নজর দেবে যাতে পিকচার পারফেক্ট ছবি আসে, কেমন?

তথ্য ও সূত্র :
http://egiye-cholo.com

Leave a Reply